Priyanka Jalan
আলোকঋণ
যেদিন জীবনের সব জানালা
নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল,
স্বপ্নের শেষ প্রদীপটিও
অশ্রুর বাতাসে নিভে গিয়েছিল—
সেদিন আপনি এলেন,
কোনো অলৌকিক আলো হয়ে নয়;
এলেন আমার অধ্যাপিকা হয়ে—
একটি অবিচল বিশ্বাস,
যে বিশ্বাস মৃত্যুকেও হার মানায়।
আপনার একটি বাক্য
আমার কাছে এক নতুন ভোর;
আপনার একটি আস্থা
আমার কাছে এক নতুন জীবন।
গৃহের নীরব সীমানা পেরিয়ে
আপনিই দেখিয়েছেন দিগন্ত;
আজ আমার কণ্ঠে জাগে প্রেরণা,
কলমে জ্বলে মানুষের প্রতি মমতা,
সেবায় খুঁজি জীবনের অর্থ।
আপনি আমাকে সাফল্য দেননি—
শিখিয়েছেন নিজেকে জয় করতে;
আপনি আমাকে পথ দেননি—
শিখিয়েছেন পথ নির্মাণ করতে।
জন্ম দিয়েছেন আমার মা,
কিন্তু বাঁচার সাহস শিখিয়েছেন
আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপিকা।
তাই আমার প্রতিটি অর্জনের অন্তরালে
নীরবে উচ্চারিত হয় একটি নাম।
আপনি আমার জীবনের
সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় নন—
আপনি সেই আলো,
যার দীপ্তিতে আজও
আমার অন্তরের সূর্য অস্ত যায় না।
Date- 30/7/26
Written by- Priyanka Jalan
চূড়ান্ত সমাপ্তি
যদি আবার জন্মের আগে
সৃষ্টিকর্তা প্রশ্ন জাগে—
"কোথায় চাও তোমার ঠিকানা?"
আমি বলিব মাথা নত করে—
চাই না সোনার সিংহাসন,
চাই না জয়ের অলংকরণ;
চাই না পৃথিবীর বিস্ময়-দ্বার,
চাই না ইতিহাসের অহংকার।
শুধু দিও—
বাংলার সেই মাটির ঘর,
সাঁঝের প্রদীপ, শঙ্খের স্বর;
দুয়ারে দাঁড়ানো মায়ের হাসি,
ভোরের শিশির, কাশের বাঁশি।
কারণ—
ইউরোপ বিস্ময়,
ইতালি সৌন্দর্য,
রোম ইতিহাস,
চীন মহাকালের ধ্যান।
কিন্তু—
মায়ের একটি ডাক—
"আয়"—
এই এক শব্দের কাছে
পৃথিবীর সকল ভাষা নতজানু।
মায়ের একটি হাসির আলোয়
সহস্র সূর্য ম্লান হয়ে যায়;
মায়ের একটি আশীর্বাদের তলে
স্বর্গও নতশিরে স্থান চায়।
তাই—
যেদিন থামিবে কালের রথ,
নিভে যাবে নক্ষত্রের পথ;
সেদিনও আমার শেষ পরিচয়—
মায়ের ছায়াতেই আমার স্বর্গময়।
যেদিন স্তব্ধ হবে জীবনের গান,
থামিবে সময়ের সকল টান,
শেষ নিশ্বাসে বলিব শুধু—
"মা"—এই নামেই অনন্ত প্রাণ।
কারণ—
স্বর্গ কোনো দূরের দেশ নয়,
মায়ের ছায়াই অনন্ত আশ্রয়।
বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি,
মা-ই আমার চিরন্তন ভূমি।
Date- 30/7/26
Written by- Priyanka Jalan
আমি জিতবই
রাত্রি যদি আঁধার বোনে, ভোর তো আলো আনে,
অগ্নি যতই দহুক পথে, প্রাণ কি তবু টানে?
ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আমি স্বপ্নেরই দীপ,
হারের বুকে লিখব আমি জয়ের অনুলিপি।
কাঁটার রক্ত ফুল হয়ে যায় সাহস যদি জাগে,
পাহাড় নত হয় একদিন অদম্য অভিযানে।
নদী বলে—চল, থেমো না, সাগর ডাকে দূরে;
বিশ্বাস যেথা শিকড় গাড়ে, বিজয় ফলে সুরে।
মেঘ কি পারে সূর্যটাকে চিরদিন ঢাকিতে?
সত্য কি আর পরাজিত হয় মিথ্যার আঘাতে?
বীজের বুকে বন লুকায়, বিন্দুতে মহাসিন্ধু,
ক্ষুদ্র প্রাণে জ্বলে অনন্ত মহাকালের ইন্দু।
হার আমার শিক্ষক শুধু, ভয় আমার নয়;
প্রতিটি ক্ষত গড়ে তোলে আগামীকালের জয়।
মুকুট নয়, চাই চরিত্র; করতালি নয়, মান—
মানুষ হয়ে সত্য বাঁচাই, এ-ই আমার প্রাণ।
যদি সারা বিশ্ব বলে—"তুমি পারবে না আর",
হৃদয় আমার বজ্রকণ্ঠে ভাঙবে সেই দেয়াল।
সূর্য যেমন প্রতিদিনই ফিরে আসে নূতন,
আমার প্রাণও তেমনি জাগে অমর প্রত্যয়ে গুণ।
শেষ নিঃশ্বাস অবধি আমি সত্যেরই সৈনিক,
প্রেম আমার পতাকা হবে, সাহস হবে দিগন্তলিখিত।
কাল যদি পথ রুদ্ধ করে, সময় যদি কাঁদে—
আমার অদম্য পদধ্বনি ইতিহাসে বাঁধে।
আমি নই ক্ষণিক প্রদীপ, নিভে যাওয়া আলো নই;
আমি অনন্ত প্রত্যয়ের গান—
আমি জিতবই,
আমি জিতবই,
আমি জিতবই।
যে স্বপ্ন ঈশ্বরও দেখেননি
মহাবিশ্ব একদিন
আমাকে একটি বীজ উপহার দিল।
বলল—
"এটি কোনো বৃক্ষের বীজ নয়,
কোনো ফুলেরও নয়।
এটি এমন এক ভবিষ্যতের বীজ,
যা এখনো
নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়।"
আমি বীজটি
মাটিতে রোপণ করলাম না।
রোপণ করলাম
একজন মানুষের প্রতি
নিঃস্বার্থ দয়ার মধ্যে।
বছর কেটে গেল।
কোনো চারা গজাল না।
কোনো পাতা এল না।
আমি ভাবলাম,
সম্ভবত বীজটি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে
একজন অপরিচিত মানুষ
আরেকজন অপরিচিতকে
নিঃস্বার্থভাবে ক্ষমা করল।
সেই ক্ষমার শব্দে
পৃথিবী কেঁপে উঠল না—
কেঁপে উঠল
অনন্তের গভীরতা।
তারপর দেখলাম,
আকাশের ওপরে
আরও একটি আকাশ উন্মোচিত হলো।
যেখানে সূর্য
আলো দিয়ে জ্বলে না,
জ্বলে
মানবিক করুণার দীপ্তিতে।
যেখানে নদী
জল বহন করে না,
বহন করে
অপূর্ণ স্বপ্নের সাহস।
যেখানে বাতাস
শুধু গাছকে স্পর্শ করে না,
স্পর্শ করে
সে সত্যকে,
যা এখনো কোনো ভাষায় প্রকাশিত হয়নি।
সেই বীজটি
অবশেষে অঙ্কুরিত হলো।
কিন্তু বৃক্ষরূপে নয়।
সে জন্ম নিল
একটি নতুন বিবেক হিসেবে।
তার শাখায়
পাখিরা বাসা বাঁধল না—
বাসা বাঁধল
অসংখ্য অসম্ভব সম্ভাবনা।
তার পাতায়
শিশির জমল না—
জমল
আগামী সহস্রাব্দের
অলিখিত কবিতা।
তখন মহাবিশ্ব
প্রথমবার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল
মানুষের হৃদয়ে।
আর নীরবে বলল—
"আমি নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি,
গ্যালাক্সি সৃষ্টি করেছি,
সময় সৃষ্টি করেছি।
কিন্তু আজ
একটি নির্মল হৃদয়
আমাকেও নতুনভাবে সৃষ্টি করল।"
Date- 29/7/26
Written by- Priyanka Jalan
শিশিরের শক্তি
সৃষ্টির প্রথম নীরব উচ্চারণ যখন ভোরের কপালে জাগে,
অদেখা আলোর মন্দির হতে কে যেন শিশির হয়ে নামে।
সে আসে না শব্দের রথে, আসে না বিজয়ের পতাকা হাতে,
সে আসে নিঃশব্দ আশীর্বাদ হয়ে ঘাসের সবুজ প্রার্থনাপাতে।
নক্ষত্রেরা সারারাত যে গোপন মন্ত্র বুনে যায় আকাশজুড়ে,
ভোরবেলা শিশির হয়ে তারই অক্ষর ঝরে পড়ে ধরণীর বুকে।
প্রতিটি বিন্দু যেন অনন্তের স্বচ্ছ আয়না—
যেখানে পৃথিবী প্রথম দেখে নিজের নির্মল আত্মা।
চাঁদ তার রূপালি স্বপ্নখানি রেখে যায় শিশিরের চোখে,
বাতাস শেখায় অদৃশ্য বীণার সুর, বন শেখায় নীরব শ্লোকে।
ফুলেরা তখন সুগন্ধ নয়, প্রার্থনা হয়ে ফোটে,
আর প্রতিটি পাতা হয়ে ওঠে এক একটি সবুজ উপনিষদ।
বজ্র বলে—“আমার গর্জনে কাঁপে দিগন্তের দ্বার,”
শিশির হেসে বলে—“আমার নীরবতায় জাগে হৃদয়ের সংসার।”
আগুন পোড়াতে জানে, ঝড় ভাঙতে জানে,
শিশির শুধু ভালোবাসার অদৃশ্য বীজ বুনতে জানে।
সূর্যের অগ্নিচুম্বনে সে বিলীন হয় না—রূপান্তরিত হয় আলোয়;
যেমন সত্য কখনও মরে না, কেবল নতুন অর্থে জ্বলে রয়।
ক্ষয় তার মৃত্যু নয়, ত্যাগ তার পরাজয় নয়—
নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সে খুঁজে পায় অনন্ত বিজয়।
তাই যে মানুষ শিশিরের মতো নির্মল হতে শেখে,
তার নীরব চোখেও একদিন নক্ষত্রেরা আশ্রয় নেয়।
যে হৃদয় বিনয়ের নদী বহায়, সে-ই ছুঁয়ে ফেলে অসীম,
কারণ আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোও জন্ম নেয় ক্ষুদ্র আলোকবীজে।
এসো, শক্তির নতুন সংজ্ঞা লিখি—
অহংকারের নয়, করুণার;
বিজয়ের নয়, জাগরণের;
গর্জনের নয়, নীরব আলোর।
যেদিন পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ
এক ফোঁটা শিশিরের মতো স্বচ্ছ হবে,
সেদিন ভোর কেবল পূর্ব আকাশে নয়—
মানুষের অন্তরেও উদিত হবে।
Date- 29/7/26
Written by- Priyanka Patodia
